ভয় দেখিয়ে সংখ্যালঘুদের জমি কিনে নেন বেনজীর

2

প্রথম আলোর প্রতিবেদন।। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে প্রায় ৬০০ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। এসব জমির প্রায় সবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। তারা বলছেন, জমি বিক্রি ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। ভয় দেখিয়ে, জোর করে এবং নানা কৌশলে তাদের কাছ থেকে জমিগুলো কেনা হয়েছে।

গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে গিয়ে জমি বিক্রি করা হিন্দু পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের জমি কিনতে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়োজিত রেখেছিলেন বেনজীর আহমেদ। বেনজীর পরিবারের রিসোর্টের নির্মাণকাজের তদারক করতেন পুলিশ ও র‌্যাবের কিছু সদস্য। তাদের দিয়ে তরমুজ চাষসহ কৃষিকাজও করানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়টি প্রথম আলোর কাছে স্বীকারও করেছেন। তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্দেশ দিলে কিছু করার থাকে না।

বেনজীর আহমেদ এসব জমি কেনা ও রিসোর্ট গড়ার কাজটি করেছেন আইজিপি (২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর) ও র‌্যাবের মহাপরিচালক থাকার সময়ে (২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল)।

জমি বিক্রেতাদের একজন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বড়খোলা গ্রামের সরস্বতী রায়ের (৬২) কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি কেন জমি বিক্রি করেছেন ? প্রশ্ন শুনেই বিলাপ শুরু করেন সরস্বতী। তিনি বলেন, ‘কত কষ্ট হইরা, সুদে টাহা নিয়া জমিটুক (৩১ শতাংশ) কিনছিলাম। হেই জমিটুক দিয়া আসা নাগছে।’ জমি কে নিয়েছে ? সরস্বতী বলেন, ‘বেনজীর নিছে।’ বেনজীর কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বড় পুলিশ’ বলে শুনেছেন।

বেনজীর পরিবারের রিসোর্টের নির্মাণকাজের তদারক করতেন পুলিশ ও র‌্যাবের কিছু সদস্য। তাদের দিয়ে তরমুজ চাষসহ কৃষিকাজও করানো হয়েছে।

‘রাজি না হলে জমি যাবে, টাকাও পাবেন না’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের নামে এখন পর্যন্ত  ৬২১ বিঘা জমির খোঁজ পাওয়া গেছে, যার ৫৯৮ বিঘা গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় ও মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলায়। উপজেলা দুটি পাশাপাশি। আর বেনজীর পরিবারের জমিও দুই উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকায়। ওই এলাকার গ্রামগুলো হিন্দু অধ্যুষিত।

বেনজীর আহমেদ সেখানে সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক নামে একটি রিসোর্ট করেছেন। এই রিসোর্টে মানুষকে থাকার জন্য কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়। ১০০ টাকা দিয়ে প্রবেশ করে ঘুরেও দেখা যায়। রিসোর্টটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভেতরে খামার, নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা, শিশুদের খেলার জায়গা ও হেলিপ্যাডসহ নানা স্থাপনা রয়েছে।

রিসোর্টটি পড়েছে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম বৈরাগীরটোলায়। ওই গ্রাম ও পাশের ডোমরাশুর গ্রামে গত মঙ্গলবার (২৯ মে) গিয়ে জমি বিক্রেতা পরিবারগুলোর ২৭ সদস্যের সঙ্গে কথা হয়। তাদের মধ্যে ২৫ জনই বলেছেন, তারা জমি বিক্রি করতে চাননি, বাধ্য করা হয়েছে। তাদের ভয় দেখিয়েছেন পুলিশের পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈরাগীরটোলা গ্রামের এক জমি বিক্রেতা বলেন, তার তিন বিঘা পৈতৃক সম্পত্তি জমি কিনে নিয়েছে বেনজীরের পরিবার। তিনি বলেন, পুলিশ কর্মকর্তা তৈমুর ইসলাম বেনজীরের পক্ষে জমির মালিকদের কাছে যেতেন। গিয়ে বলতেন, ‘আমি ভালো অফিসার (কর্মকর্তা), তাই আপনাদের কিছু টাকা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। যদি বিক্রি করতে রাজি না থাকেন, তবে জমিও যাবে, টাকাও পাবেন না।’

সাভানা ইকো রিসোর্টের কাছে একটি চায়ের দোকানে পাওয়া যায় বৈরাগীরটোলা গ্রামের তরুণ সঞ্জয় বলকে। তিনি বলেন, তার পরিবারের ৩০ বিঘার বেশি জমি জোর করে কিনে নিয়েছেন বেনজীর। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে যখন এই জমি বেচাকেনা হয়, তখন বেনজীর র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন।

জমি বিক্রেতারা জানান, যারা বিক্রি করতে রাজি হতেন না, তাদের ক্ষেত্রে আরেক কৌশল নিতেন বেনজীরের লোকেরা। সেটি হলো ওই জমির আশপাশের জমি কিনে নিয়ে সেখানে যেতে বাধা দেওয়া। এর ফলে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হতেন সাধারণ মানুষেরা। মাদারীপুর রাজৈরের কদমবাড়ী ইউনিয়নের বড়খোলা গ্রামের ১২ জন জমি বিক্রেতার সবাই এভাবে তাদের জমি বিক্রিতে বাধ্য করার কথা বলেছেন।

বড়খোলা গ্রামের প্রশান্ত দত্ত বলেন, তারা সচ্ছল। জমি বিক্রি করার কোনো প্রয়োজন তাদের ছিল না। পৈতৃক জমি বিক্রির কোনো ইচ্ছাও তাদের ছিল না। তারা তিন ভাই ২৪ বিঘা জমি বিক্রি করেছেন বাধ্য হয়ে।

কোনো কোনো হিন্দু পরিবারের জমির সবটুকুই বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। তেমন একজন রাজৈরের বড়খোলা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব সরস্বতী রায়। তার ভাষ্য, তার স্বামী নিরঞ্জন রায় ২০ বছর আগে জমিটুকু (৩১ শতাংশ) কিনেছিলেন। বাধ্য হয়ে সেই জমি বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। এর বাইরে তাদের বসতবাড়িতে ৫ শতাংশ জমি ও একটি ছোট্ট খুপরি ঘর রয়েছে তাদের।

নিরঞ্জন মারা গেছেন। তার ছেলে রঞ্জন রায় দিনমজুরি করে এখন সংসার চালান। তিনি বলেন, বেনজীর পরিবারের কাছে বিক্রি করা জমির ধান দিয়েই তাদের সারা বছর চলত। এখন চালও কিনে খেতে হয়।

জীবিত মালিককে মৃত দেখিয়ে নিবন্ধন

জমি বিক্রেতারা বলছেন, জমি দলিল দেওয়ার সময় তারা কেউই বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও সন্তানদের দেখেননি। কাউকে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে, কাউকে রিসোর্টে নিয়ে জমির দলিলে সই নেওয়া হয়েছে।

যৌথ মালিকানার জমির মালিকদের কাউকে কাউকে মৃত দেখিয়েও জমি কেনার ঘটনা পাওয়া গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে রাজৈরের বড়খোলা গ্রামের প্রণব বিশ্বাসের ক্ষেত্রে। তারা তিন ভাই। প্রণব বলেন, তার ছোট ভাই পূর্ণেন্দু বিশ্বাস ১৯৮৮ সালে ভারতে চলে যান। সেখানেই কয়েক বছর আগে তার মৃত্যু হয়। তার (পূর্ণেন্দু) দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে, যারা ভারতে থাকেন। প্রণবের আরেক ভাই প্রশান্ত বিশ্বাস এক বছর আগে ভারতে গিয়ে আর ফেরেননি।

প্রণবের অভিযোগ, তাদের তিন ভাইয়ের ১৪২ শতাংশ জমি (প্রায় সাড়ে চার বিঘা) ফাঁদে ফেলে কিনে নেয় বেনজীর আহমেদের পরিবার। এ ক্ষেত্রে তার দুই ভাইকে মৃত এবং ওয়ারিশহীন দেখানো হয়। বিক্রি দলিলে তার একার সই নেওয়া হয়। তিনি বলেন, এখন এলাকার লোকজন বলছে, আমি ভাইদের জমি আত্মসাৎ করেছি। কিন্তু কী পরিস্থিতিতে আমি এই কাজ করেছি, সেটা তো কেউ জানে না।

প্রণবের ভাষ্য, তার বসতবাড়ির জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিষয়ে বিরোধ ছিল। সেই সুযোগ নিয়ে তার বসতবাড়ির জমির একটি ভুয়া দলিল করা হয়। তখন পুলিশ কর্মকর্তা তৈমুর ইসলাম তাকে বলেন, বেনজীরের রিসোর্টের কাছের জমি বিক্রি না করলে বসতবাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করা হবে।

পৈতৃক সম্পত্তি হস্তান্তর করতে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ারিশ সনদ নিতে হয়। সেই সনদ ছাড়া জমি বিক্রি করা যায় না। প্রণবের দাবি, তিনি কোনো কাগজপত্র জোগাড় করেননি। সবই করেছেন পুলিশ কর্মকর্তা তৈমুর।

প্রণবের নামে কোনো ওয়ারিশ সনদ নেওয়া হয়েছিল কি না, জানতে চাওয়া হয়েছিল রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান  শ্রীবিধান বিশ্বাসের কাছে। তিনি দাবি করেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভুয়া কোনো ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়নি।

এদিকে বেনজীর পরিবারের রিসোর্টের মধ্যে কৃষি খামারে কাজ করার সময় ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট’ হয়ে ২০২০ সালের এপ্রিলে মারা যান গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সুখ দেব বল (১৯)। তার ভাই সুব্রত বল বলেন, ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন তার বাবা শুসেন বল। তবে পুলিশ কর্মকর্তা তৈমুরের হুমকিতে তারা মামলা করেননি। তৈমুর ঘটনা চেপে যেতে সুব্রতকে সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। যদিও চাকরি বা ক্ষতিপূরণ কোনোটাই পাননি তারা।

তৈমুরও ‘দুর্নীতিবাজ’

গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে বেনজীর পরিবারের জমি কেনার কাজ করা পুলিশ পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম ১৯৯৫ সালে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় কর্মরত থাকাকালীন ২০০২ সালের জুনে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে তিনি বিভাগীয় মামলায় জিতে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) যোগ দেন। ২০১৩ সালের জুনে তিনি পরিদর্শক হন।

গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বেনজীরের পক্ষে জমি কেনার কাজ করার সময় তৈমুর খুলনা মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে নিয়মিত গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে গিয়ে বেনজীরের পক্ষে জমি কেনার কাজ করতেন। পরে ২০২১ সালে তাকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দুর্নীতির অভিযোগে ২০২১ সালের মার্চে তৈমুরের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, খুলনার সহকারী পরিচালক তরুণ কান্তি ঘোষ বলেন, মামলাটিতে এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

বেনজীর আহমেদের পরিবারের পক্ষে জমি কেনার কাজ করার বিষয়ে বক্তব্য জানতে তৈমুর ইসলামের মুঠোফোনে কল করা হলে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, তৈমুর ব্যস্ত আছেন। পরে কেউ আর ফোন ধরেননি। প্রশ্ন লিখে পাঠানো হলেও উত্তর পাওয়া যায়নি।

দুদকের মামলায় তৈমুরের স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে খুলনা সদরের খান জাহান আলী সড়কের একটি বাড়ি। বাড়িটিতে গিয়েও তাকে বা তার পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালে খুলনার ময়ূরী আবাসিক এলাকায় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বেনজীর আহমেদের তিন মেয়ের নামে একটি সাড়ে সাত কাঠার প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্লটটি পাওয়ার ক্ষেত্রে বেনজীরের হয়ে তদবির করেছেন তৈমুর ইসলাম। তৈমুর নিজেকে খুলনার সাবেক এক মেয়রের ভাগনে পরিচয় দিতেন।

জমি কেনার ক্ষেত্রে তৈমুরের সহযোগী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে অপূর্ব বল নামে গোপালগঞ্জের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তিনি ২০২২ সালে সাহাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্যার (বেনজীর) জোর করে কারও জমি কেনেননি।’ তার দাবি, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগে তার পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে বেনজীর আহমেদের কোনো ভূমিকা ছিল না।

রিসোর্টে কাজ করতেন র‌্যাব-পুলিশের সদস্যরা

বেনজীর আহমেদের পরিবারের রিসোর্টের সঙ্গে সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও সেখানে কাজ করতেন র‌্যাব ও পুলিশের কিছু সদস্য। রিসোর্ট এলাকার গ্রামের বাসিন্দা ও রিসোর্টে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করা একাধিক ব্যক্তি জানান, বেনজীর অবসরে যাওয়ার আগপর্যন্ত রিসোর্টে শ্রমিকেরা ঠিকভাবে কাজ করছেন কি না, সেটি দেখভালের দায়িত্ব পালন করতেন র‌্যাব ও পুলিশের কিছু সদস্য। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন দুই উপপরিদর্শক (এসআই) বাচ্চু মিয়া ও শাহজালাল।

বাচ্চু মিয়া এখন খুলনায় পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে কর্মরত। তিনি গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত র‌্যাব-৮এ কর্মরত ছিলেন। এ সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে বিভিন্ন সময় তিনি রিসোর্টে যেতেন। সেখানে তার দায়িত্ব ছিল শ্রমিকেরা ঠিকমতো কাজ করছেন কি না, সেটি তদারকি করা।

বাচ্চু মিয়া র‌্যাবে কর্মরত থাকার সময় যখন রিসোর্টে কাজের তদারকি করতে যেতেন, তখন বেনজীর আহমেদ র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিবারের ব্যবসায়িক কাজে নিয়োজিত হওয়ার বিষয়ে বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘নির্দেশ দিলে কিছু তো আর করার থাকে না।’

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, বেনজীর পরিবারের রিসোর্টের ভেতরে কৃষি খামারে তরমুজ চাষের দায়িত্বে ছিলেন এস আই শাহজালাল। তিনি এখন কোথায় চাকরিরত, তা জানা যায়নি। তবে গত বৃহস্পতিবার (৩০ মে) সকালে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিকেলে আপনার অফিসে এসে বিস্তারিত কথা বলব। যদিও তিনি আসেননি, আর ফোনও ধরেননি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্র জানায়, বেনজীর পরিবারের রিসোর্ট তৈরির প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে ছিলেন একজন নারী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।

বেনজীরের পরিবারের রিসোর্টের আশপাশের জলাভূমিতে মাছ ধরতে যাওয়ায় মারধরের অভিযোগ রয়েছে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় জেলে নিত্য বালা বলেন, ঘটনাটি এক বছর আগের। তিনি রাতে মাছকান্দি বিলে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। একটু দূরেই বেনজীরের মাছের ঘের। বিলে মাছ ধরার সময় হঠাৎ চারটি নৌকায় পুলিশ সদস্যরা এসে তাকেসহ তিনজনকে ধরে নিয়ে যান। রিসোর্টে নিয়ে তাদের মারধর করে থানায় দেওয়া হয়।

নিত্য বালার ভাষ্য, ১০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি মাছ চুরির মিথ্যা মামলা থেকে রক্ষা পান। তবে নৌকাসহ মাছ ধরার সরঞ্জামাদি ফেরত পাননি।

তবে রাজৈর থানার এসআই লোকমান হোসেন দাবি করেন, পুলিশ নয়, নিত্য বালাকে রিসোর্টের লোকজন ধরেছিল। পরে পুলিশে খবর দিয়ে তাকে থানায় পাঠানো হয়। লিখিত কোনো অভিযোগ না দেওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কোনো টাকা নেওয়া হয়নি।

রিসোর্টের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই

বেনজীর পরিবার যেখানে রিসোর্ট করেছে, সেটা নাল শ্রেণির নিচু জমি। রিসোর্ট তৈরি করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ জেলার সহকারী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ১১ একর জমিতে রিসোর্ট করা হচ্ছে, এমন একটি অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল এক বছরের জন্য। সেটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। আর ৮ একর জমিতে কৃষি খামার করতে এক বছরের জন্য অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল। সেটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের জুনে।

মাহফুজুর রহমান বলেন, অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়ার পর চূড়ান্তভাবে পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে হয়। তবে সাভানা রিসোর্ট এমন কোনো আবেদন করেনি।

‘সেটা অন্যায় ও অপরাধ’

বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অনুসন্ধানে কমিটি করে দুদক। সংস্থাটি এখন পর্যন্ত বেনজীর পরিবারের ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং তিনটি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) খুঁজে পেয়েছে। আদালতের আদেশে এসব সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য জানতে বিগত তিন দিন নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তা সম্ভব হয়নি। তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে এবং ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠানো হয়েছে। কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

গত মঙ্গলবার (২৮ মে) দুপুরে সাভানা রিসোর্টে গেলেও ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। দায়িত্বশীল কেউ কথা বলতেও রাজি হননি। বেনজীর আহমেদের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। সেখানে তিনি থাকেন না। গুলশানের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েও তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। দুদক সম্পদের অনুসন্ধান শুরুর পর বেনজীর আহমেদ জনসমক্ষে আসছেন না। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, বেনজীর আহমেদ সপরিবারে সিঙ্গাপুরে চলে গেছেন।

হিন্দুদের কাছ থেকে জোর করে জমি কেনা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের ব্যক্তিগত কাজে নিয়োগের বিষয়ে সাবেক আইজিপি ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক কাজে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পুলিশ সদস্যদের নিয়োজিত করতে পারেন না। যদি সেটা করা হয়, সেটা অন্যায় ও অপরাধ। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা জমি কিনতে পারেন। সেটা নিয়মনীতি মেনে এবং বৈধ অর্থ দিয়ে। দেখতে হবে, বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছে কি না, অর্থের উৎস কী।

উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিরত অবস্থায় জমি কেনা কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে বেনজীর আহমেদ সরকারের অনুমতি নেননি।