এক বছরে ১০৪৫ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ৪৫ জন নিহত

5

সংবাদদাতা।। সারা দেশে গত এক বছরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা-নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৪৫টি। এসব ঘটনায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৪৫ জন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন।

গত বছর বাংলাদেশের ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত সহিংসতা-নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (০৯ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত গণমাধ্যমে আসা তথ্যের ভিত্তি প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি। মরদেহ উদ্ধার (হত্যাকান্ড বলে প্রতীয়মান) হয়েছে ৭ জনের। হত্যার চেষ্টা হয়েছে ১০ জনকে। হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে ৩৬ জনকে। হামলা/শারীরিক নির্যাতন/জখম হয়েছে ৪৭৯ জন। চাঁদা দাবি করা হয়েছে ১১ জনের কাছে। বসতঘর/ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা/ভাঙচুর/লুটপাট/অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১০২টি। বসতবাড়ি/জমিজমা দখলের ঘটনা ঘটেছে ৪৭টি। বসতবাড়ি/জমিজমা দখলের/উচ্ছেদের তৎপরতা ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি। দেশত্যাগের হুমকি/বাধ্য করার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ১১টি। দেবোত্তর/মন্দির/গির্জার সম্পত্তি দখল ও দখলের চেষ্টার ঘটনা হয়েছে ১৫টি। শ্মশানভূমি দখল/দখলের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ৭টি। মন্দিরে হামলা/ভাঙচুর/লুটপাট/অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি। প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে ৪০টি। দলবদ্ধ ধর্ষণ/ধর্ষণ/ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ২৫টি। অপহরণ/নিখোঁজ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের ঘটনা ঘটেছে ১২টি। ধর্ম অবমাননার কল্পিত অভিযোগে আটক হয়েছেন ৮ জন। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৩২টি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৫টি। এ ছাড়া অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ১৪টি। মোট ঘটনা ১ হাজার ৪৫টি।

সংবাদ সম্মেলনে এসব ঘটনাকে ‘আংশিকমাত্র’ বলে উল্লেখ করেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সহিংসতার ঘটনার খুব বেশি হেরফের আজও হয়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু ছিল প্রায় ১৯ শতাংশ। এখন তা ৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার পরিবেশ একেবারেই সংকুচিত করা হয়েছে। পুলিশি প্রহরায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান-উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে।

সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলাকালে সন্ত্রাসীদের কাউকে জনগণ আটক করলে পুলিশ-প্রশাসন তাকে ‘পাগল’ বানিয়ে মূলত সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকেই উৎসাহিত করে।

সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ভূমিকেন্দ্রিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ভূমি জবরদখলের বদ মতলবে ভূমিখেকো সন্ত্রাসীরা প্রায় বেশির ভাগ সময় নানা রাজনৈতিক দলের প্রভাবপুষ্ট হয়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংস আক্রমণ পরিচালনা করছে। সরকারি সংস্থাও জমি জবরদখলের ঘৃণ্য কাজে জড়িত।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী অপশক্তি রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, রাজনীতি, সমাজসহ সর্বক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অধিকতর নিরাপত্তাহীন ও আস্থাহীন করে তুলছে। তাঁদের দেশত্যাগে কৌশলে বাধ্য করা হচ্ছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন রোধে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়নসহ আওয়ামী লীগের ইশতেহারে থাকা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিষদের অন্যতম সভাপতি নিমচন্দ্র ভৌমিক ও নির্মল রোজারিও, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ ও ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক শুভ্র দেব কর। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক দীপংকর ঘোষ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ

করোনাকালীন সময়ের পূর্বাপর বছরগুলো ছাড়া প্রতি বছর আমরা বাংলাদেশের ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার চালচিত্র ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরে এসেছি। এবারেও আমরা বিগত এক বছরের অর্থাৎ জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত সময়কালের চালচিত্র আপনাদের সামনে আজ উত্থাপনের পূর্বে ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর শারদীয় দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীর দিন থেকে ঐ বছরের ১ নভেম্বর পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা উপস্থাপন করছি। আমাদের পর্যবেক্ষণে সে সময়কালে মোট আক্রান্ত জেলার সংখ্যা ছিল ২৭, মোট আক্রান্ত মন্দির/পূজোমন্ডপ ছিল ১১৭টি, মোট আক্রান্ত বসতবাড়ী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩০১, মোট নিহতের সংখ্যা ছিল ৯ জন (পুলিশের গুলিতে নিহত ৪ জনসহ)। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর-এ সাত মাসের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের চালচিত্রে দেখা যায়, ঐ সময়কালে হত্যার শিকার হয়েছে ১৭ জন, হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছে ১০ জন, হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে ১১ জনকে, ধর্ষণের/গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩০ জন, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৬ জনকে, শ্লীলতাহানির কারণে আত্মহত্যা করেছে ৩ জন, জোরপূর্বক অপহরণের শিকার হয়েছে ২৩ জন, অপহরণের চেষ্টা হয়েছে ২ জনকে, নিখোঁজ ছিল ৩ জন, প্রতিমা ভাংচুর হয়েছে ২৭টি, মন্দিরে হামলা/ভাংচুর/অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ২৩টি, শ্মশান/ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি দখলের ঘটনা ঘটেছে ৫টি, বসতভিটা/জমিজমা থেকে উচ্ছেদের ঘটনা ঘটে ২৬টি, বসতভিটা/জমিজমা/শ্মশান থেকে উচ্ছেদের অপপ্রয়াসের ঘটনা ঘটে ৭৩টি, দেশত্যাগের হুমকি দেয়া হয় ৩৪ জনকে, গ্রামছাড়া করা হয় ৬০টি পরিবারকে, ধর্মান্তরিত হওয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল ৪ জনকে, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয় ৭ জনকে, বসতভিটা/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর/অগ্নিসংযোগ/লুটপাটের ঘটনা ঘটে ৮৮টি, দৈহিক হামলায় গুরুতর জখম হয় ২৪৭ জন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ত্রাণ বিতরণকালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানানো হয় ২০টি পরিবারকে, মহানবীকে কটুক্তির মিথ্যা অভিযোগে আটক করা হয় ৪ জনকে।

বিগত ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে জুলাই ২০২২ পর্যন্ত সময়কালের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ছিল এরকম: হত্যার শিকার ২১ জন, হত্যাচেষ্টার শিকার ১ জন, হত্যার হুমকির ঘটনা ঘটেছে ৩টি, হামলা/শারীরিক নির্যাতন/জখমের শিকার হয়েছে ৯৩ জন, বসতঘর/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা/ভাংচুর/অগ্নিসংযোগ/লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৭০টি, চাঁদা দাবির ঘটনা ১টি, বসতবাড়ি/জমিজমা দখলের ঘটনা ঘটেছে ৩৬টি, বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হয়েছে ২৮টি চাকমা পরিবার, উচ্ছেদের হুমকি দেয়া হয়েছে ১টি পরিবারকে, দেবোত্তর/মন্দির/গীর্জায় হামলা/অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৩৭টি, প্রতিমা ভাংচুর হয়েছে ৮১টি, শ্মশান দখল/দখলের চেষ্টা ঘটেছে ৫টি, অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, জায়গাজমি থেকে উৎখাতের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি, ধর্ষণ/গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩টি, ধর্মীয় অনুভূতি কথিতমতে আঘাতের ঘটনায় আটক হয়েছে ৮ জন।

আজকের এ সংবাদ সম্মেলনে বিগত বছরগুলোয় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক চালচিত্রের স্বরূপ উল্লেখ করা হলো চলতি ২০২৩ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণের জন্যে। এ সময়কালে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি, মরদেহ উদ্ধার (হত্যাকান্ড বলে প্রতীয়মান) হয়েছে ৭ জনের, হত্যার চেষ্টা হয়েছে ১০ জনকে, হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে ৩৬ জনকে, হামলা/শারীরিক নির্যাতন/ জখম হয়েছে ৪৭৯ জন, চাঁদা দাবি করা হয়েছে ১১ জনের কাছ থেকে, বসতঘর/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা/ভাংচুর/লুটপাট/অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১০২টি, বসতবাড়ি/জমিজমা দখলের ঘটনা ঘটেছে ৪৭টি, বসতবাড়ি/জমিজমা দখলের/উচ্ছেদের তৎপরতা ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি, দেশত্যাগের হুমকি/বাধ্য করার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ১১টি, দেবোত্তর/মন্দির/গীর্জার সম্পত্তি দখল ও দখলের চেষ্টার ঘটনা হয়েছে ১৫টি, শ্মশানভূমি দখল/দখলের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ৭টি, মন্দিরে হামলা/ভাংচুর/লুটপাট/অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৯৪টি, প্রতিমা ভাংচুর হয়েছে ৪০টি, গণধর্ষণ/ধর্ষণ/ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ২৫টি, অপহরণ/নিখোঁজ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের ঘটনা ঘটেছে ১২টি, ধর্ম অবমাননার কল্পিত অভিযোগে আটক হয়েছে ৮ জন, জাতীয় নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে ৩২টি, স্থানীয় নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে ৫টি, অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ১৪টি, মোট ঘটনা ঘটেছে ১,০৪৫টি।

এ সংখ্যাটি সাম্প্রদায়িক চালচিত্রের একটি আংশিক অংশমাত্র। বিগত বছরগুলোর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সহিংসতার ঘটনার খুব বেশী হেরফের আজও হয়নি। এহেন বিরাজমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে লক্ষণীয়, ১৯৭০ এর নির্বাচনকালীন সময়ের প্রায় ১৯% সংখ্যালঘু ৮.৬%-এ নেমে এসেছে।

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের চালচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিশেষ করে সংখ্যালঘু স্বর্ণব্যবসায়ী ও তাদের পরিবার, মন্দির ও উপাসনালয় এবং বিগ্রহ, সংখ্যালঘুদের জায়গা-জমি ও স্কুল কলেছে পড়–য়া অপ্রাপ্তবয়ষ্ক মেয়েরা সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার পরিবেশ একেবারেই সংকুচিত করা হয়েছে। পুলিশ প্রহরায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলাকালে সন্ত্রাসীদের কাউকে জনগণ আটক করলে পুলিশ প্রশাসন তাকে ‘পাগল’ বানিয়ে মূলত সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকেই উৎসাহিত করে। ফেইসবুক হ্যাক করে ধর্ম অবমাননার কল্পিত অভিযোগে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িকে আক্রমণের শিকার করছে, অহেতুক যুবক সম্প্রদায়কে হয়রানি করছে। সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ৭০ থেকে ৭৫% ভূমিকেন্দ্রিক। ভূমি জবরদখলের বদমতলবে ভূমিখেকো সন্ত্রাসীরা প্রায় বেশীরভাগ সময় নানান রাজনৈতিক দলের প্রভাবপুষ্ট হয়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এ সাম্প্রদায়িক সহিংস আক্রমণ পরিচালনা করছে। সিটি কর্পোরেশনের মতো সরকারি সংস্থাও জমি জবরদখলের ঘৃণ্য কাজে জড়িত। ঢাকায় অতিসাম্প্রতিককালে বংশালের আগাসাদেক লেনের মিরনজিল্লা হরিজন পল্লী, যাত্রাবাড়ীর ধলপুরের তেলেগু কলোনী এবং কমলাপুর রেল লাইনের পাশের হরিজন পল্লীর বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের কোন ব্যবস্থা না করে তাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের অপপ্রয়াসের দুঃখজনক অমানবিক ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। চলতি বছরের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের নেতাদের ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অপপ্রয়াসও দুঃখের সাথে লক্ষ্য করা গেছে। শুধু তাই নয়, এ দু’টি নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তারা মূলত সরকারি দলের। কেউ দলীয় প্রতীকে, কেউবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। লক্ষ্য করা গেছে ব্যতিক্রমবাদে প্রার্থীদের অনেকে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভোটদানে নানানভাবে শুধু বিঘœই সৃষ্টি করেনি, প্রকারান্তরে সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। এ বিভাজনের কারণে নির্বাচনের পক্ষ-বিপক্ষের হাতে সংখ্যালঘু জনাগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন নির্বাচনে নতুন এক মাত্রা যুক্ত করেছে।

ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আপামর বাঙালি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী একাকার হয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, সীমাহীন আত্মত্যাগ করেছে। এরই মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে আবির্ভাব ঘটে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। ৭২’র সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হয়। সংবিধানের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ ব্যক্তিজীবনে, সমাজজীবনে, রাষ্ট্রজীবনে ও রাজনৈতিক পর্যায়ে কিভাবে নিশ্চিত করা যাবে তা বিশদভাবে উল্লেখিত ছিল। কিন্তু, সংবিধানের এই যে সাংবিধানিক ধারা তার চর্চা ও প্রয়োগের সূচনা ঘটার মূহুর্তে ১৯৭৫’র ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে খুন করা হয় এবং এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করা হয়। কবি শামসুর রাহমান এ পর্যায়ে খেদোক্তি করে তাঁর এক কবিতার পঙক্তিতে লিখেছিলেন, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ’। পরবর্তীতে বাংলাদেশকে অধিকতর সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার অভিপ্রায়ে ১৯৭৭ সালে জারিকৃত মার্শাল ল প্রক্লেমেশনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানকে পাকিস্তানি সংবিধানের আলোকে ধর্মীয় মোড়কে আচ্ছাদিত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধর্মীয় সংখ্যাগুরু জনগণের ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে সংযোজিত করে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিসত্তাকে ধর্মের ভিত্তিতে শুধু খন্ডিত করা হয় নি, জনগণনার দিক থেকে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে ধর্মীয় বৈষম্যের দিকে ঠেলে দেয়া হয় এবং তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয়। প্রায় ২১ বছর সামরিক বেসামরিক নানান লেবাসে ক্ষমতা দখলকারী শক্তিসমূহ ৭১’র পরাজিত শক্তিকে সাথে নিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে ছড়িয়ে দেয়। বিগত ১৫ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল ক্ষমতায় আসীন হওয়া সত্ত্বেও আজও সংবিধানকে ৭২’র ধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় নি। পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাতিলকৃত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ এবং ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ সংবিধানে ফিরে এলেও সাম্প্রদায়িক আবরণ ও আভরণ থেকে সংবিধান মুক্ত হতে পারে নি। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে মেলবন্ধন বা তোষণ কার্যতঃ তাদেরকে উৎসাহিত করেছে। এর ফলে বাঙালিত্ব ক্রমশঃ সংকুচিত হচ্ছে, আত্মপরিচয়ের সংকট তীব্রতর হচ্ছে, সংস্কৃতিতে সংকট চলছে। এ সুযোগে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী অপশক্তি রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, রাজনীতি, সমাজসহ সর্বক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অধিকতর নিরাপত্তাহীন ও আস্থাহীন করে তুলছে এবং তাদের দেশত্যাগকে কৌশলে বাধ্য করা হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হলেও আজও তা কার্যকর হতে পারেনি এবং এর মধ্যে দিয়ে পাহাড়ে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রাখা হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। ২০০১ সালে তথাকথিত শত্রু (অর্পিত) সম্পত্তি আইন বাতিল করে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন পার্লামেন্টে গৃহীত হলেও বাস্তবায়নের মুখ দেখতে পারেনি। প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঘাপটি মেরে থাকা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এদেশের ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে দেয় নি। বরং নানান উছিলায় তাদের হয়রানি ও সর্বস্বান্ত করে তুলেছে। অব্যাহত সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন ও আইনের প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করে কার্যতঃ সংখ্যালঘুদের ভূমিহীন করার এহেন দুষ্ট অভিসন্ধি একদিকে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যদিকে দেশের গণতান্ত্রিক ভিতকে ক্রমশই দুর্বল করে দিচ্ছে।

এহেন পরিস্থিতিতে ঐক্য পরিষদের দাবিকে যথাযথ বিবেচনায় এনে সরকারি দল আওয়ামী লীগ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বেশকিছু সংখ্যালঘু স্বার্থবান্ধন অঙ্গীকার করে। যদিও এ অঙ্গীকারসমূহের বেশীরভাগই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও সরকারি দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তার কোনটিই বাস্তবায়ন করা হয় নি।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারসমূহের মধ্যে রয়েছে- (ক) সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ব আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের’ ধারা সুরক্ষার উদ্যোগ অব্যাহতকরণ; (খ) অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন প্রয়োগের বাধা দুরীকরণ; (গ) জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন; (ঘ) বিএনপি-জামাত জোট সরকারের ‘এথনিক ক্লিনজিং’ অপনীতির কবলে যে সব অমানবিক ঘটনা ঘটেছে তার বিচারকার্য সম্পন্নকরণ এবং তার পুনরাবৃত্তি রোধকরণ; (ঙ) ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চির অবসান, জীবন সম্পদ সম্ভ্রম মান-মর্যাদা সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিতকরণের নীতি অব্যাহতকরণ; (চ) দেশের সকল অনগ্রসর অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন এবং ঐ সব অঞ্চলের জনগণের জীবনের মানোন্নয়নে অগ্রাধিকার প্রদান।

আজকের এ সংবাদ সম্মেলন থেকে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ইতোমধ্যে প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু স্বার্থবান্ধব অঙ্গীকারসমূহ পূরণে আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই।